ফিদেল কাস্ত্রো: কিউবার দ্য ড্রামমাস্টার অফ রেভলিউশন
ফিদেল কাস্ত্রো—কারও কাছে মহান বিপ্লবী নেতা, আবার কারও কাছে কর্তৃত্ববাদী শাসক। ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার এক ধনী কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া কাস্ত্রো পরবর্তীতে মার্ক্সবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে কিউবার বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন এবং প্রায় পাঁচ দশক দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
ফিদেল কাস্ত্রো অনুসারীদের কাছে ‘এক মহান নেতা’ আর বিরোধীদের কাছে ‘ফ্যাসিবাদী’।
ঠোটে ধরা চুরুট, মুখে দাড়ি, পরনে সবুজ সামরিক পোশাক, মাথায় একই রঙের ক্যাপ। বিশ্বাস করেন সাম্যবাদ অথবা মৃত্য এই স্লোগানে। নাম ফিদেল কাস্ত্রো।
১৩ আগস্ট ১৯২৬, ধনী কৃষক আনহেল মারিয়া বাউতিস্তা কাস্ত্রোর ঘরে জন্ম হয় এক ছেলে সন্তানের। ছেলের নামে রাখলেন ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ। কাস্ত্রোর পিতা ছিলেন স্পেন থেকে আসা কিউবার একজন ধনী কৃষক।
প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন সান্তিয়াগোর ক্যাথলিক স্কুলে। সেখান থেকে যোগ দেন হাভানার কলেজ এল কলেজিও ডে বেলেন-এ। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময়ে কাস্ত্রো রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ফিদেল কাস্ত্রো অনুসারীদের কাছে এক মহান নেতা এবং বিরোধীদের কাছে ফ্যাসিবাদি।
সারা বিশ্বের রাজনীতিতে যখন কমিউনিস্ট রাজনীতির করুন অবস্থা, ঠিক তখনই পুঁজিবাদীর নাকের ডগাতেই সমাজতন্ত্রের ধ্বজা তুলে রেখেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। ফিদেল কাস্ত্রোর জীবনের গল্প বিপ্লবী আন্দোলন, স্নায়ুযুদ্ধ, পূর্ব-পশ্চিম দ্বন্দ্ব, পুঁজিবাদ এবং কমিউনিজমের সংঘাতের সঙ্গে এতটাই মিশে গেছে যে, একে অপরের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালে কিউবার প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের কন্যা মার্টা ডিয়াজ বালার্টের সাথে বিয়ে করে ফিদেল কাস্ত্রো। এই বিয়ের মাধ্যমে তিনি দেশটির অভিজাত শ্রেণীর অংশ হতে পারতেন, কিন্তু তিনি মার্ক্সবাদে গভীরভাবে প্রবেশ করেন। কাস্ত্রোর বিশ্বাস ছিল যে কিউবার পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেশের সব সমস্যা সৃষ্টি করছে এবং শুধুমাত্র জনগণের বিপ্লবই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে।
১৯৫৯ সালে গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কিউবার শাসক বাতিস্তাকে উৎখাত করে কিউবার ক্ষমতায় আসেন ফিদেল কাস্ত্রো। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৩ বছর। প্রায় পাঁচ দশক ধরে কিউবা শাসন করার সময় তিনি কোনো পরাশক্তি, ষড়যন্ত্র, কিংবা মৃত্যুভয়ের সামনে মাথানত না করে এবং নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থেকেছেন।
ফিদেল কাস্ত্রো তার শাসনকালে কিউবাকে তিনি এমন শিক্ষার মান কাঠামো প্রদান করেছিলেন যা প্রথম বিশ্বের দেশগুলির সমতুল্য এবং এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যা অনেক দেশের জন্য ঈর্ষার কারণ। কিউবানদের গড় আয়ু এবং শিশুমৃত্যুর হার ইউরোপের সাথে অতুলনীয় ছিলো। যদিও তাদের মাথাপিছু আয় ছিল উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে, তিনি লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করেছেন। এই কারনে তিনি মার্কিন সরকারের কাছে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফিদেল কাস্ত্রোকে প্রায় ৬ শত ৩৮ বার হত্যাচেষ্টা করা হয়েছিলো। যার প্রতিটি চেষ্টা ই ব্যার্থ হয়। এ সময়ে পাঁচ ভাগে সিআইএ, যুক্তরাস্ট্রের প্রতিরক্ষাবাহিনী ও স্বরাস্ট্র বিভাগ তাকে হত্যার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়।
দ্য মুভমেন্ট
বাতিস্তার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা দখল করার পর, তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ কিউবানদের অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে। বাতিস্তার শাসনে কিউবা যৌন ব্যবসা, জুয়া ও মাদকের আড্ডায় পরিণত হয়, যা উচ্ছৃঙ্খল ধনীদের জন্য এক প্রকার স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। মার্কিন মদদপুষ্ট বাতিস্তাকে আদালতে নেবার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হন কাস্ত্রো। এক সময় কাস্ত্রো বুঝতে পারলেন আইনের পথে বাতিস্তা কে হটানো অসম্ভব। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ কাস্ত্রো ‘দ্য মুভমেন্ট’ নামে একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন।
১৯৫৩ সালের জুলাইয়ে কাস্ত্রোর গেরিলা বাহিনী সান্তিয়াগোর কাছে মানকাডা সেনা ছাউনিতে আক্রমণ পরিকল্পনা করে, তবে এটি ব্যর্থ হয়। এই আক্রমণে ৯০ জন বিপ্লবী নিহত হন এবং অনেকে ধরা পড়েন। ফিদেল কাস্ত্রো এবং তার ভাই রাউল কাস্ত্রো তখন পালিয়ে গেলেও পরে তাদের গ্রেফতার করা হয়। শেষপর্যন্ত, বিচারে তাঁকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বিচার ও কারাবরণ বিপ্লবী নেতা হিসেবে কাস্ত্রো দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের কারনে ২ বছর পর তিনি মুক্তি লাভ করেন।
মুক্তির পর, গ্রেপ্তার এড়াতে কাস্ত্রো মেক্সিকো চলে যান। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে চে গুয়েভারা এবং ফিদেল কাস্ত্রো পরিচিত হন। কাস্ত্রোর সাথে চে’র প্রথম সাক্ষাতে দীর্ঘ আলাপচারিতা হয়, যেখানে চে কিউবার সমস্যা নিয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সেই সময়, চে গুয়েভারা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং চে বিশ্বাস করতেন যে এই আগ্রাসনের অবসান হওয়া দরকার।
বিপ্লবের পরিকল্পনায় কাস্ত্রোর প্রথম পদক্ষেপ ছিল মেক্সিকো থেকে কিউবায় আক্রমণ করা। ১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর, কাস্ত্রো ও তার সঙ্গীরা কিউবায় যাত্রা শুরু করেন। পৌঁছানোর পর, তাদের বাহিনী বাতিস্তার সেনাবাহিনীর দ্বারা আক্রমণ করা হয়। এই অভিযানে ৮২ জন সহচরী নিহত হন নয়তো কারাবন্দী হন, আর মাত্র ২২ জন জীবিত থাকেন। চে গুয়েভারা তার বইতে উল্লেখ করেছেন যে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময়, তিনি একজন কমরেডের ফেলে যাওয়া গোলাবারুদ বহন করছিলেন, যা তার চিকিৎসক থেকে বিপ্লবী হিসেবে রূপান্তরের পথে সহায়তা করেছিল।
সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ে বিদ্রোহীদের একটি ছোট অংশ পুনরায় সংগঠিত হতে সক্ষম হয়। সেখানে তারা ২৬শে জুলাই আন্দোলনের গেরিলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তা লাভ করে। এই সময়, কাস্ত্রোর একটি সাক্ষাৎকার নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়, যা ১৯৫৭ সালের আগে পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ জানত না যে তিনি জীবিত আছেন কি না। সেই নিবন্ধে কাস্ত্রো ও বিপ্লবীদের কাল্পনিক ছবি প্রকাশিত হয়।
চে গুয়েভারা কাস্ত্রোকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কূটনীতি এবং অধ্যবসায়ের কথা জানান। যুদ্ধ চলাকালীন, চে বিদ্রোহী বাহিনীর একটি অখণ্ড অংশ হিসেবে কাজ করেন। কাস্ত্রো চে’কে গ্রেনেড তৈরির কারখানা, রুটি বেকারির চুল্লি প্রস্তুতকরণ, এবং নিরক্ষর সঙ্গীদের শিক্ষার জন্য পাঠশালা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেন। এছাড়া, একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, সামরিক প্রশিক্ষণের কর্মশালা আয়োজন করেন, এবং তথ্য বিতরণের জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্বও প্রদান করেন। তিন বছর পর, টাইম ম্যাগাজিন চে গুয়েভারাকে "কাস্ত্রোর মস্তিষ্ক" হিসেবে উল্লেখ করে।
চে গুয়েভারা কাস্ত্রোর ২৬শে জুলাই আন্দোলনের দলে যোগ দেন। ১৯৫৯ সালের ২ জানুয়ারি, বিদ্রোহীরা হাভানায় প্রবেশ করে এবং বাতিস্তা পালিয়ে যায়। এই সময়ে, বাতিস্তার অনেক সমর্থককে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
কিউবার ক্ষমতায় ফিদেল কাস্ত্রো
বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। ১৯৫৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিপ্লবের পর তাঁর সরকার ভূমি সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং বিদেশি মালিকানাধীন সম্পদ জাতীয়করণের মতো একাধিক পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে কিউবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে।
কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবা ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৬১ সালের শেষ দিকে তিনি প্রকাশ্যে নিজেকে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী হিসেবে ঘোষণা করেন। একই সময়ে কিউবার সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক শীতল যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতে পরিণত হয়।
বে অব পিগস আক্রমণ ও কাস্ত্রোর বড় বিজয়
ফিদেল কাস্ত্রোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কিউবান নির্বাসিতদের একটি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের ১৭ এপ্রিল তারা কিউবার দক্ষিণ উপকূলের Bay of Pigs বা প্লায়া গিরোন এলাকায় আক্রমণ চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা CIA এই অভিযানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
কিন্তু অভিযানটি শুরু হওয়ার পরপরই পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। কাস্ত্রোর বাহিনী দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং আক্রমণকারীরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। শতাধিক আক্রমণকারী নিহত হয় এবং এক হাজারেরও বেশি মানুষ বন্দী হয়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
বে অব পিগসের ব্যর্থতা ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক অবস্থানকে বরং আরও শক্তিশালী করে। কাস্ত্রো এই ঘটনাকে কিউবার বিপ্লবের বিরুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কিউবা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করে।
কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট
১৯৬২ সালে ফিদেল কাস্ত্রো, সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির মধ্যে সংঘাত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নজরে আসার পর শুরু হয় Cuban Missile Crisis।
১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর একটি মার্কিন U-2 গোয়েন্দা বিমান কিউবার মাটিতে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের প্রমাণ সংগ্রহ করে। কিউবা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছেই—ফ্লোরিডা থেকে মাত্র প্রায় ৯০ মাইল দূরে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সংকটের অবসান ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে সম্মত হয়। এই ঘটনা শীতল যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিউবার জন্য এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—ফিদেল কাস্ত্রো তখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছের একটি ছোট দেশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোটবদ্ধ করে বিশ্বের দুই পরাশক্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ফিদেল কাস্ত্রোর সমাজতান্ত্রিক কিউবা
ফিদেল কাস্ত্রোর শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি ছিল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন। তাঁর সরকার ব্যাপক সাক্ষরতা কর্মসূচি চালায় এবং স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করে। কাস্ত্রোর সমর্থকেরা এসব অর্জনকে কিউবার বিপ্লবের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
কিউবার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়। বিশেষ করে নিরক্ষরতা কমানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার কাস্ত্রো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তবে কাস্ত্রোর কিউবার গল্প শুধু সাফল্যের গল্প ছিল না। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মানবাধিকার নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং বিরোধীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কিউবার রাজনৈতিক পরিবেশকে কঠোর করে তুলেছিল।
অন্যদিকে কাস্ত্রোর সমর্থকেরা যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈরী আন্তর্জাতিক পরিবেশের মধ্যেও কিউবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ধরে রাখতে পেরেছিল।
এই দুই বিপরীত মূল্যায়নের কারণেই ফিদেল কাস্ত্রো আজও ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত
কাস্ত্রো ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। কিউবার অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ জাতীয়করণ করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং পরবর্তীতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায়।
কাস্ত্রো সরকার এই নিষেধাজ্ঞাকে কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে দেখত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে পশ্চিম গোলার্ধে সোভিয়েত প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করত।
এর ফলে প্রায় পুরো শীতল যুদ্ধজুড়েই ফিদেল কাস্ত্রো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত চলতে থাকে।
ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার ষড়যন্ত্র
ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার জন্য বিভিন্ন সময়ে একাধিক ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আসে। বিষ প্রয়োগ, বিস্ফোরক এবং অন্যান্য গোপন পরিকল্পনার মতো নানা পদ্ধতির কথা বিভিন্ন নথি ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কাস্ত্রো নিজেও বহুবার দাবি করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা CIA তাঁকে হত্যার জন্য অসংখ্য পরিকল্পনা করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত এসব ষড়যন্ত্রের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন দাবি থাকলেও, কাস্ত্রোকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য মার্কিন সরকারের গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছিল—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক নথিতে প্রমাণ রয়েছে।
এই কারণে ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত এবং তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং কিউবার কঠিন সময়
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কিউবার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। কারণ কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল কিউবার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগী।
সোভিয়েত সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিউবা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়ে। এই সময়কে কিউবার ইতিহাসে Special Period হিসেবে উল্লেখ করা হয়। খাদ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দেয়।
তবুও ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতা ধরে রাখেন। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তাঁর সরকার পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেয় এবং ইউরোপ ও কানাডার মতো দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করে।
প্রায় পাঁচ দশকের শাসন
ফিদেল কাস্ত্রো প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে কিউবার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। তিনি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেন, অন্যদিকে কিউবাকে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ধরে রাখেন।
তাঁর শাসনামলে কিউবা একদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাক্ষরতার ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন করে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও তৈরি হয়।
এই কারণেই ফিদেল কাস্ত্রোকে মূল্যায়ন করতে গেলে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন বিপ্লবী নেতা। বিরোধীদের কাছে তিনি ছিলেন দীর্ঘদিন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা একজন কর্তৃত্ববাদী শাসক।
রাউল কাস্ত্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর
২০০৬ সালে অসুস্থতার কারণে ফিদেল কাস্ত্রো সাময়িকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায়িত্ব তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রোর হাতে তুলে দেন। কয়েক বছর পর ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কিউবার প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রো দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
তবে ক্ষমতা ছাড়ার পরও ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে থেকে যান। তিনি বিভিন্ন সময় সংবাদপত্রে কলাম লিখেছেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন।
ফিদেল কাস্ত্রোর শেষ জীবন
ক্ষমতা ছাড়ার পর ফিদেল কাস্ত্রো তুলনামূলকভাবে জনসম্মুখে কম আসতেন। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা আগের তুলনায় অনেক কমে যায়। তবে কিউবার জনগণের একটি অংশের কাছে তিনি বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে থেকে যান।
অন্যদিকে কিউবার বাইরে থাকা বহু নির্বাসিত কিউবান এবং তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা তাঁর শাসনকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে আসছিলেন। ফলে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন একই সঙ্গে প্রশংসিত এবং বিতর্কিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যু
২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর ফিদেল কাস্ত্রো ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর কিউবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর কিউবায় রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
তবে তাঁর মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ একরকম নয়। কিউবার অনেক মানুষ তাঁকে বিপ্লবের নেতা হিসেবে স্মরণ করলেও, মিয়ামিসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত কিউবান নির্বাসিতদের একটি বড় অংশ তাঁর মৃত্যুতে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাঁদের কাছে কাস্ত্রোর শাসন ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।
ইতিহাসে ফিদেল কাস্ত্রোর অবস্থান
ফিদেল কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবনকে শুধুমাত্র একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন কিউবার বিপ্লবের প্রধান নেতা, শীতল যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
একটি ছোট ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্রের নেতা হয়েও তিনি কয়েক দশক ধরে বিশ্বের দুই পরাশক্তির সংঘাতের কেন্দ্রে ছিলেন। বে অব পিগস আক্রমণ, কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—সবকিছু মিলিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোর জীবন বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তাঁর শাসনামলে কিউবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল। ফলে ফিদেল কাস্ত্রোকে নিয়ে ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন আজও এক নয়।
কারও কাছে তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বিপ্লবী নেতা, আবার কারও কাছে তিনি ছিলেন কর্তৃত্ববাদী শাসক। কেউ তাঁর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্যকে সামনে আনেন, আবার কেউ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক সংকটের কথা স্মরণ করেন।
তবে একটি বিষয় নিয়ে বিতর্কের অবকাশ কম—ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লব শুধু একটি দেশের সরকার পরিবর্তন করেনি; বরং শীতল যুদ্ধ, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
আজও ফিদেল কাস্ত্রো, কিউবার বিপ্লব এবং কিউবার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলে একই প্রশ্ন ফিরে আসে—ফিদেল কাস্ত্রো কি ছিলেন একজন মহান বিপ্লবী নেতা, নাকি একজন কর্তৃত্ববাদী শাসক?
সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বাস্তব উত্তর হলো—তিনি একই সঙ্গে এমন একজন নেতা, যার কিছু নীতি ও অর্জন প্রশংসিত হয়েছে, আবার যার শাসনব্যবস্থার বহু দিক কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছে। আর এই দ্বৈত পরিচয়ই ফিদেল কাস্ত্রোকে ইতিহাসের পাতায় এতটা বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।